তামিম ইকবালকে বিসিবি সভাপতি: আবেগের সিদ্ধান্তে ঝুঁকির মুখে ক্রিকেট

0
38

অভিজ্ঞতার অভাব, অস্থায়ী নেতৃত্ব ও প্রক্রিয়াগত প্রশ্ন—উঠছে নানা বিতর্ক

ইঞ্জিনিয়ার মো. মেহেদী মাসুদ

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে (বিসিবি) সাম্প্রতিক পরিবর্তনের অংশ হিসেবে সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালকে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একজন জনপ্রিয় ও সফল ক্রিকেটারের এই পদে আসা নিঃসন্দেহে আলোড়ন তৈরি করেছে। কিন্তু ক্রিকেট পরিচালনার মতো একটি জটিল প্রশাসনিক দায়িত্বে এমন একটি নিয়োগ কতটা যৌক্তিক—তা নিয়ে প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। দেশের ক্রিকেট যখন নানা সংকটের মধ্যে রয়েছে, তখন এই সিদ্ধান্তকে অনেকে আবেগনির্ভর এবং ঝুঁকিপূর্ণ বলেই মনে করছেন।

প্রথমত, অভিজ্ঞতার বিষয়টি এখানে সবচেয়ে বড় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। তামিম ইকবাল মাঠে একজন প্রতিষ্ঠিত ক্রিকেটার হলেও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতায় তিনি একেবারেই নতুন। একটি জাতীয় বোর্ড পরিচালনা করতে হলে প্রয়োজন কৌশলগত পরিকল্পনা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং নীতিনির্ধারণী দক্ষতা—যা একজন খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ারের অংশ নয়। ফলে এই নিয়োগ অনেকটা “পরীক্ষামূলক” সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে, যার ফলাফল অনিশ্চিত।

দ্বিতীয়ত, নিয়োগ প্রক্রিয়াটি নিজেই বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বোর্ড ভেঙে দিয়ে সরাসরি নতুন সভাপতি নিয়োগ করা হয়েছে, যা একটি স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় এ ধরনের হস্তক্ষেপ ভবিষ্যতে রাজনৈতিক প্রভাবের পথ সুগম করতে পারে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এই ধরনের পদক্ষেপকে সাধারণত নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হয়, কারণ এটি প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ করে।

তৃতীয়ত, তামিমের নেতৃত্বে যে কমিটি গঠিত হয়েছে, তা একটি অস্থায়ী বা অ্যাড-হক কাঠামো। স্বল্প সময়ের জন্য দায়িত্ব নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার বাস্তবায়ন করা প্রায় অসম্ভব। অথচ বিসিবির বর্তমান সমস্যাগুলো—ঘরোয়া ক্রিকেটের দুর্বলতা, অবকাঠামোগত ঘাটতি এবং প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা—এসব সমাধানের জন্য প্রয়োজন স্থায়ী ও ধারাবাহিক নেতৃত্ব।

এছাড়া, খেলোয়াড় থেকে প্রশাসকে রূপান্তরের ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাতের বিষয়টিও উপেক্ষা করা যায় না। তামিম দীর্ঘদিন জাতীয় দলের অংশ ছিলেন এবং বর্তমান খেলোয়াড়দের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা কঠিন হতে পারে। বোর্ড পরিচালনায় এই ধরনের সম্ভাব্য পক্ষপাতিত্ব ভবিষ্যতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিসিবি যে সংকটের মধ্যে রয়েছে, তা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আস্থার সংকট, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং উন্নয়ন পরিকল্পনার অভাব—এই তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ এখন বোর্ডের সামনে। এই অবস্থায় একজন অনভিজ্ঞ নেতার ওপর দায়িত্ব দেওয়া সমস্যার সমাধানের পরিবর্তে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।

সবশেষে, এই নিয়োগে জনপ্রিয়তার প্রভাব অস্বীকার করা কঠিন। তামিম ইকবাল দেশের ক্রিকেটে একটি বড় নাম এবং তার জনপ্রিয়তা হয়তো এই সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে জনপ্রিয়তা নয়, বরং দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচ্য। অন্যথায়, সিদ্ধান্তগুলো দীর্ঘমেয়াদে দেশের ক্রিকেটের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

তামিম ইকবালকে বিসিবি সভাপতি করা নিঃসন্দেহে একটি সাহসী পদক্ষেপ। তবে এটি যতটা আশাব্যঞ্জক, ততটাই ঝুঁকিপূর্ণ। যদি এই সিদ্ধান্ত সঠিকভাবে পরিচালিত না হয়, তবে এটি বাংলাদেশের ক্রিকেটকে আরও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে। এখন সময়ই বলে দেবে—এটি পরিবর্তনের সূচনা, নাকি আরেকটি ভুল পদক্ষেপ।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে